এক বসন্ত স্বাধীনতার জন্য

পর্ব ২

ঘরে তার প্রায় ডজন খানেক ছেলে মেয়ে। সাতটি ছেলে, পাঁচটি মেয়ে। শেষেরটির বয়স এখন কুড়ি দিন। নেহাতই দুধের শিশু! তবে তাতে ওর স্বামী হীরেন ঠিক যেন নিশ্চিন্ত হতে পারে না! আসলে এরা শুধু তো সন্তান নয় ওদের কাছে বরং এরা এই বর্মন দম্পতির জন্য এদেশে ক্রমশঃ বাড়াতে থাকা মৌলিক অস্তিত্ত্বের শিকড়! এই বনাঞ্চল, পায়ের নীচের পাতালকক্ষ, মাথার উপরে অনন্ত সীমাহীন নক্ষত্রবীথি, পরিব্যাপ্ত মহাকাশ এসবের মাঝে প্রতিস্থাপন করা একটা নিজস্ব ‘আমি’কে স্থায়ী নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করার অলংকার! প্রতিবার পোয়াতি হলে সদরের সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয় কমলা। প্রতিবার বাচ্চার সাথে নতুন সরকারি কাগজ। আসলে কমলা-হীরেন-পার্বতী মায় পুরো এই বর্মন পরিবার, এমনকি এই জনপদের অধিকাংশ বাসিন্দাই তো এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা নয়! এদের অনেকেই কয়েক যুগ আগে পরিযায়ী হয়ে চলে এসেছে বাংলাদেশ থেকে। কেউ আবার এসেছে আসাম থেকে। এদের স্বাভাবিক জীবনভঙ্গিমায়, স্বত্ত্বায়, প্রবণতায় এপার ওপার মিলে মিশে গেছে খুউব সহজ বিবর্তনে। এদের শৈশব কৈশোর হয়তো সনাতনী জল হাওয়ার মতোই ভাগ হয়ে গেছে দেশকালের সীমানায়। কিন্তু ভাষা, সংস্কৃতি, সুর এগুলোকে কি এতো সহজে ভাগ করা যায়? ইদানীঙ সরকারি অফিস থেকে ভোটের কাজ করতে এসে বাঁকা চোখে তাকায় ওরা এদের দিকে। সে দৃষ্টিতে কখনো কখনো কপট চাতুরীর সাথে চিনির মতো গুলে থাকা মৌলিক বঞ্চনাবাদের ভ্যাজাল দৃষ্টিকটুভাবে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে! প্রতি রাতে তাই হীরেনের পুরুষ শরীর জেগে ওঠে, সদ্য খোলস ছাড়া চা বাগানের রাজগোখরোর মতন! বর্ষার মেঘের মতো ছড়ানো চুলে কুসুমিত কামিনী তেলের হাহাকার নিয়ে পড়ে থাকা কমলার লোলচর্মসার শরীরটাকে জড়িয়ে ধরে সে হাতড়ায় কামড়ায়! তার আঙুলের প্রতিটা নখে লেখা হতে থাকে লালা, মাংস আর রক্তের অযুত সহজপাঠ! আকাঙ্খার উন্মাদ আগুন জ্বলে যেন! কমলার স্তনের বোঁটা বেয়ে দুধ বেরিয়ে এসে ভিজে যায় চারপাশ! হীরেনের দাপাদাপি তবু থামে না! যেন কাঁটা বসানো ক্ষুরধার লিঙ্গ তার! কমলার জরায়ুর বেদনা ভুলতে দিতে চায়না সে কোনোমতে! ঢুকিয়ে, পেঁচিয়ে প্রতিদিন নতুন করে খনন করে চলে সে কমলার যোনিদেশ! তিরতির করে কাঁপতে থাকা লম্ফের আলোয় সে গমন পথে রাতের অবয়ব ক্রমশঃ স্পষ্ট হয়ে ওঠে! ফুলে ওঠা ঠোঁট, শরীর জোড়া কালো কালশিটে, ঝুলে যাওয়া স্তনবৃন্তে কস্তুরীহীন, চিনচিনে, হেঁচড়ানো সম্ভ্রমহীনতা নিয়ে দূরে কান পাতে কমলা। রাতের বুক চিরে তখন পাথরে পাথরে জলের ধাক্কা লাগার শব্দ, জঙ্গলের নিস্তরঙ্গ নীরবতা এড়িয়ে নিশাচর পাখিদের ডাক, নিশিকৃষ্ণতিথিতে অদ্ভুত লয়ে নিরলস জৈবিক কসরতে ব্যস্ত ঝিঁঝিঁ পোকার ঝমাঝম নগরকীর্তন, আশ্লেষী হায়নার পিশাচ হাসি এসবের পাশাপাশি ঝুপড়ির ঠিক বাইরেটা থেকে লোহার শিকলের একটা হালকা ঠুনঠুন শব্দ ভেসে আসে। জঙ্গলের ভেতর গাছপালার গভীরতা ভেদে যেমন আলো আঁধারি বাড়ে কমে, ঠিক তেমন নদীর বুক বেয়ে বয়ে চলা বিভ্রান্ত হাওয়াটার ধাক্কায় শব্দগুলোর গভীরতা যেন কমতে থাকে! কেমন ফাটা ফাটা অস্পষ্ট হয়ে মাত্রা হারিয়ে ফেলে শেষে! ফি বছর হীরেনের স্থায়ী নাগরিকত্ত্বের পক্ষে দাখিল করতে চাওয়া চামড়া মাংসের কাগজপত্রগুলোকে নিজের গর্ভ দিতে না পাড়ার পাপ ধুয়ে ফেলতে ফেলতে, কমলা যেন দেখতে পায় বাইরে বাঁধা হাতিটা ভীষণ অস্থির হয়ে উঠেছে এখন! ঘন ঘন মাথা নাড়ছে! পিছনের দুপায়ের মাঝে শিকলটাকে হ্যাচকা টানে খুলে ফেলতে চাইছে! এ আজ নতুন কিছু না। কমলা দেখেছে প্রায় প্রতি রাতেই এই সময়টায় হাতিটা যেন ক্রমশঃ অস্থির হয়ে ওঠে। ওদের সঙ্গমের তীব্রতা যত বাড়ে তত যেন চঞ্চল হয়ে ওঠে সে! মাস ছয়েক হোল মূর্তি বিট অফিস থেকে হাতিটাকে দিয়ে গেছে হীরেনের জিম্মায়। জলদাপাড়া ফরেস্ট অফিস যখন হস্তীশাবকটিকে ওর মায়ের থেকে আলাদা করার পদ্ধতি শুরু করেছিল তখন হয়ত সেটির বয়স চার বছর! ফি বছরই এই কাজ চলে। মায়ের থেকে আলাদা করার সময় মা হাতিটির অস্থিরতায় তটস্থ থাকতে হয় বনদপ্তরের সকলকে! এসময় তাকে শান্ত রাখে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের অন্যান্য কুনকি হাতির দল। এসবই কমলা শুনেছে হীরেনের মুখে। হীরেন বেশ কয়েক বছর ধরে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে একটা পার্ট টাইম কাজ বাগানোর ধান্দায় ছিল। মাহুত হবার ট্রেনিং নিয়েছে সে বেশ কিছুদিন। নিজে হাতে হাতি বাঁধার দড়ি বানিয়েছে। ওর মতন আরো অনেকেই ট্রেনিং নিয়েছে যদিও। তার পর প্রধান মাহুত বাসের আলীকে হাত করে, এটা সেটা ফাই-ফরমাস খেটে দিয়ে, কিশোরগঞ্জের দোক্তা পাতা সাপ্লাই দিয়ে, আস্তে আস্তে মাহুত হবার বিশ্বাস সে অর্জন করেছে। এখন সে নিজেই বুক ফুলিয়ে, ছুঁচলো গোঁফের আগা সরু করে বলে, “হামরা বর্মন! মাহুতের জাত! মোর দাদা পরদাদা আসাম থাকি হাতি ধরি আনি, পোষ মানি খেলা দেখাইত।” হাতিটাও দিব্যি এখন হীরেনের পোষ মেনেছে। হীরেনই বলতে গেলে এখন ওর ‘মাহুত বন্ধু’! হাতিটাকে সেই এখন চান করায়, খেতে দেয়, তার পিঠে চেপে জঙ্গল, নদীর ধার চড়তে বেরোয়। রোজ একবার বিট অফিসে রিপোর্ট করে আসে। সেসময় রাখালিয়া বাঁশিতে সুর তোলে হীরেন। তার বাঁশির সুরে জঙ্গলের শাল-সেগুন-গামার গাছে জন্ম নেয় কয়েকশো চুমুর রোমান্টিকতা! হয়তো ওর না বলা ভালোবাসাগুলো অব্যক্ত প্রেম আর ব্যর্থযাপনের কবিতা হয়ে তাতে মিশে থাকে। যেন এক আদিম অরণ্যমানবের সবুজ হারানো উদাস কথকতা, দূরের পাহাড়ের গায়ে তোলা অদৃশ্য দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে ফিরে আসে, এক ফোঁটা গাঢ় বাদামী রঙের জাদু ধ্বনি হয়ে! হাতিটা সত্যি দিব্যি পোষ মেনেছে হীরেনের! পেছনে বাড়ি মেরে ‘বোট’ বললে হাটু গেঁড়ে বসে পড়ে! হাতের বেতের লাঠিটা দিয়ে একটু খুঁচিয়ে ‘মাইল’ বললে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করে! আবার একটু চেঁচিয়ে ‘তিরে’ বললে কাত হয়ে শুয়ে পড়ে! হাতিটার সামনে গিয়ে হীরেন ‘ধের’ বললে কেমন শুঁড়ে করে পেঁচিয়ে ধরে ওকে! ব্যালেন্স করে ওর কাঁধে চড়ে বসে হীরেন। প্রতিদিনের কাজের ফাঁকে এসবই দূর থেকে লক্ষ্য করে কমলা। হাতিটার পেছনের পা দুটো একটা মোটা দড়ি দিয়ে বাঁধা এখনো! পাটের দড়িটা রোদে পুড়ে জলে ভিজে হলদে হয়ে গেছে। দড়িটা সোজা উঠে হাতিটার পেটের তলা দিয়ে ঘুরিয়ে লেজের তলায় পাক দিয়ে বাঁধা। একে মাহুতদের ভাষায় ‘জাঙ্গিয়া’ বলে। এই বাধনটার ফলে তার লেজটা একটু উঁচু হয়ে আছে এবং লেজ নাড়লে হাতিটার ঈষৎ কালচে যোনিদেশ বেরিয়ে পড়ছে মাঝে মাঝে। হাতিটা এখন আপন মনে আখের ছোলা চিবোচ্ছে। ধীর পায়ে সেটার কাছে এগিয়ে যায় কমলা। প্রশিক্ষণের প্রথম কয়েক মাস গলার কাছে রশি দিয়ে কষে বাঁধা থাকে। একে বলে ‘ফাঁদ’! তাছাড়াও বুকের কাছ থেকে জড়িয়ে সামনের পা দুটোও বাঁধা থাকে। তাকে মাহুতেরা বলে ‘বুক ফারা’। হীরেনের মুখে শুনেছে কমলা, পোষ মানানোর প্রথম দিনের কথা! সে দৃশ্য বড় নির্মম! হাতিটার চারটে পা চারটে খুঁটির সাথে বেশ মোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে এই বাঁধনগুলো পড়াবার কাজ চলে। সেসময় হস্তীশাবকটির কান ফাটানো চিৎকারে পুরো জঙ্গল কেঁপে ওঠে! অনেক টানা হ্যাঁচড়ার পর স্ব-যাপনের যুদ্ধে হেরে যায় হাতিটি! তার শূন্য, ক্লান্ত শরীর মাটিতে লুটিয়ে পড়ে! স্তব্ধ হয় তার যাবতীয় তর্জন গর্জন! স্মৃতি ঘোলাটে হয়, অনুজ্জ্বল চোখদুটো জুড়ে তার ঘুম নেমে আসে। হাতিটার গায়ে বাঁধনগুলো হয়তো তখন কষে বসে গেছিল! সে দাগ এখনো সুস্পষ্ট! জায়গাগুলোয় হাত রাখে কমলা। ওর হাতের তালুর নীচে কয়েকটা অমসৃণ বলিরেখা ভেসে চলে যায়। ওর হাতের নাগালের ভিতর হাতিটার পিঠের শুকিয়ে যাওয়া ফোস্কাগুলো জেগে থাকে শুধু, শুকনো পাথরের গায়ে ঋতুর হাত ধরে জন্ম নেওয়া, অদৃশ্য ফাটলের অন্ধকার নিয়ে। মাকে ছেড়ে আসার শোক, শৈশব হারিয়ে ফেলার অভিমান আর লড়াই করে বেঁচে থাকার অহংকার এসব নিয়েই কবে যেন বড় হয়ে গেছে এই হস্তীশাবক। সে এখন তার মাহুতকে ভোলাতে জানে। সময় সময় নাকরা করে ব্যস্ত করে তুলতে পারে। পৃথিবীর বুকে এর থেকে বড় ভালোবাসার দৃশ্য হয়তো আর কিছু নেই! শুধু কমলা কাছে এলেই হাতিটা পিছন ফিরে দাঁড়ায়! মুখ ঘুরিয়ে নেয় অন্যদিকে! কমলা যেন ওর কতকালের সতীন! এই মুহূর্তে হাতিটার সাথে একটা চেনা অচেনার আত্মময়তা অনুভব করে কমলা। শিরা ধমনীতে বহমান নিঃশব্দ সে আবেগ, মূর্তির কুলুকুলু স্রোতের মতোই স্নিগ্ধ, স্বচ্ছ! একদিন মা বাপের ঘর ছেড়ে সেও এসেছিল হীরেনের কাছে। ঘরকন্যার সুখ পেতে জঙ্গলের বুকে হঠাৎ করে উড়ে এসে জুড়ে বসা নিতান্ত অপ্রয়োজনীয় শিয়ালকাঁটার মতোই হয়তো সেও ভেসে এসেছিল। এখন গোটা শীতকাল জুড়ে পেয়ে বসা স্মৃতির অবসন্নতা আর মূর্তির প্রায় নিশ্চিহ্ন শরীর জুড়ে বেছানো ঠান্ডা বিছানার চাদর চিরে, সদ্য যুবতীর সোহাগের ওম এনে দেওয়া চৈত্র শেষের তপ্ত রোদকে ফিকে করে দিয়ে, ডেকে যায় শুধু নিখাদ ভালোবাসার লোভে কপাল পোড়ানো, কুলত্যাগী কোন এক চরিত্রহীনা কোকিলা! কমলার নিজের বিয়ের দিনের গীত মনে পড়ে যায়।

বাবার বাড়ি রে।

সারি সারি রে।।

কোথা গিয়া পাইলা মধু।

বৈদেশী ভ্রমরা রে।।”

কুশে বাঁধা পড়েছিল দুটো হাত। আলতা চিহ্ন মাখামাখি সে হাতের রেখা যেন তখন তৃপ্ত মধুভান্ডের মতোই পূর্ণ! এতদিন এই যুগল পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। কিন্তু সেই লগনে রূপবতী লাবণ্যে যেন পুনর্জন্ম হয়েছিল কমলার। মধুল গান, সারি গান, পান-তামুল, খৈ ছেটানো আর কলা গাছের সারিকে স্বাক্ষ্মী রেখে, উজ্জ্বল প্লাবনে ভেসে গেছিল কমলার যৌবনবতী শরীর, ডাগর ডাগর চোখ, ডিঙি নৌকার মতন বাঁকানো মুখ, ভারী বুক, টিকোলো চিবুক! যেন চাঁদের আলোয় ভিজছে বনস্থলী! ফেলে আসা জীবনের যাবতীয় দুঃখ গন্ধকে মুছে ফেলে সে যেন তখন এক নতুন জীবনের আলোয় ফেরা। পাথুরে পথের ধুলো জড়িয়ে আরো নব নব প্রাণে ছড়িয়ে পড়া তেল হলুদের গন্ধমাখা আঁচলে। ওর ভাতারকে সেই প্রথমবার দেখে ওর পছন্দ হয়েছিল খুব। বেশ নির্মেদ, পেশীবহুল, টানটান চেহারা যেন ফুট ছয়েক লম্বা ধনুকের একটা ছিলা। দেখলেই কেমন যেন ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। মরদ হীরেনকে দেখে কমলার নরম বুকে তীব্র কর্ষণ ইচ্ছা জেগে উঠেছিল সেদিন! ঠিক ততক্ষণ কর্ষণ যতক্ষণ না অবধি ফাঁপা কুয়োয় জমে থাকা ধাতুরস দুকূল ছাপিয়ে গৃহস্থের বাড়ি ভাসিয়ে দেয়। শ্বশুরবাড়িতে এসে বৌ দেখানোর সময় এই পার্বতীই ওর মুখ দেখে বলেছিল, “এ ছয়রি মায়া জানেই! আজি থেকেই মোর দেবর বশ হল!” আঁকা বাঁকা সর্পিল পথে স্থিরচিত্রের মত স্থির হয়ে যাওয়া যায় এমন একটা জড়তা ছিল সেদিন পার্বতীর চোখের চাহনিতে! তারপর চোখে ঈষৎ বাঁকা দৃষ্টি এনে সামনে রাখা ধানের গোছা থেকে বেশ কিছুটা ধান মুঠো করে নিয়ে, ওর সিঁথিতে ছড়িয়ে দিয়েছিল। সে দৃশ্যে এসে সজোরে ধাক্কা দিয়ে একখানা আস্ত রামধনু এঁকে দিয়ে গেছে তখন, টলটলে দু একটা ভবঘুরে হাওয়ার স্মৃতি! পাশে বসা পুরুষটির মুখে তখন নির্নিমেষ তৃপ্তির হাসি। আসে পাশে শুধু পক্ককেশ রাজবংশী বৃদ্ধা গোষ্ঠীর মুখরিত গুঞ্জন। আশীর্বাদ পর্ব সেরে পার্বতী তার দেবর আর দেবরানীর কপালে আলতো করে চুমু দিয়েছিলো। শ্রাবনের জলভরা মেঘ যেমন স্রোত নিয়ে আসে মূর্তির বুকে, জঙ্গল ঋতুমতী হয়, ওজন লাগে তার ভারী শরীরে, ঠিক তেমন একটা সমর্পিত স্তনভারে পার্বতীর শরীরটা ঝুঁকে পরেছিলো সামনের দিকে। অনিমেষ মায়ায় ভরা সে চুম্বন! যেন অনেক দূর দিয়ে ভেসে গেছে নির্বাক কল্পনারা! দিনের দূরগামী আলোর গভীরে যেন তাতে বোনা হয়ে আছে, ক্রোধ-ভয় আর সমবেদনার রূপবতী অক্ষর! এর পরের সাংসারিক জীবনে অবশ্য পার্বতী আর বিশেষ সদ্ভাব রাখেনি কমলার সাথে! জঙ্গলে কাঠ কুড়ানো, শুয়োর গরু প্রতিপালন, রাত জেগে হাতির হাত থেকে ক্ষেত পাহারা দেওয়া, এসব কাজ সমানে সমানে ভাগ হয়ে গিয়েছে। এমনকি বিষুয়ায় আটকলাই-বাটকলাই ভেজে বাড়ির চালে ছড়ানো, ঘরের দরজায় পিয়াজ-রসুন-পানিমুদ্রি পাতা-বেতের ডাল ঝোলানো ইদ্যাদি লোকাচার কিংবা বকা পিঠা, পাকন পিঠা, চিতই পিঠা বা নাড়ু বানানো এইসবই ওরা করেছে হাসিমুখে। সবার সামনে দেখিয়েছে ওরা কত ভাল আছে! মিলে মিশে আছে! কিন্তু কমলা ঠিকই বুঝতে পারে ওর বিয়ের পর থেকেই ভিতরে ভিতরে একটা জং ধরা কাতরতায় ডুবে গেছে পার্বতী! নিজের অসম্পূর্ণতাকে চেপে রেখে সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকে, অপছন্দকে গ্রহণ করলে যেমন হয় কিংবা যেমনটা হয় নিজের একান্ত পছন্দকে বুকে পাথর চেপে পর করে দিলে! কমলার কাছে এর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই তাই আর এসব নিয়ে ভাবলে কষ্টও হয়না ওর! হাতে হাতে তিল আর খেঁজুর গুড় জড়ো করে ঢেঁকিতে দেয় পার্বতী আর তালে তালে পা চালায় কমলা। যেন একই পুরুষের সাথে সফল আসক্ত একটি সঙ্গমের পর কোনো কাল্পনিক নাগরদোলার দুই মাথায় চড়ে বসেছে দুই নারী! একদিকে শর্তাধীন নীরবতা আর অন্যদিকে অশুচী একাকীত্ত্ব! দুজনেই আপাত ক্রিয়াশীল কিন্তু ভেতরে ভেতরে কি ভীষণ হিসেবী! যেন চরম ব্যক্তিগত কোন সুখে বা অসুখেও কেউ কাউকে একবার জিজ্ঞেস করবে না, “কেনে আছো?” (কেমন আছো?)


Discover more from Shikor

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Leave a Reply

Trending

Discover more from শিকড়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading