এক বসন্ত স্বাধীনতার জন্য
শেষ পর্ব
এখানে এখন ধূসর আকাশ মাথার ওপর ঝুলে থাকে সুঠামদেহী কোন পরপুরুষের মতন! তার গায়ে মেঘেরা লেগে থাকে লুকোনো কোন বিষণ্ণতা নিয়ে। অলক্ষ্যে ভিজে ওঠে বাতাস। শ্যামলা রঙের বিকেলবেলাটায় যেন পুরোনো কোন কান্নার গন্ধ মিশে থাকে। এখানে এখন জন্ম-মৃত্যু-যৌনতা-নাগরিকত্ত্ব চাপা পরে থাকে ছেঁড়াফোড়া শুকনো পাতার মতন। পাথুরে মাটির গা বেয়ে উল্লাস আর বিষাদের লুকোচুরি খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে পড়া মূর্তি নদীর শীতল জলে পা দিলে, এই ক্ষরতপ্ত বসন্তের বিকেলবেলাতেও হালকা শীত শীত ভাব হয়। নদীর পশ্চিমের তট বরাবর ধানক্ষেত নেমে গেছে ধাপে ধাপে। এসময় বেশ অনেকক্ষণ ধরে বেশ অনেকটা ওপর থেকে, পরিশ্রমী চিলের আতসী চোখে মূর্তিকে দেখলে মনে হয়, অন্ধকারের গভীর থেকে উঠে আসা শীর্ণকায় এক বালুপথ! যেন ঋতুমতী নিঃসঙ্গ তরুণীটি! আশেপাশের পরিচিত সবকিছুর ছোয়াঁচ বাঁচিয়ে সে একাকী হেঁটে চলেছে দূরে, কিছু রঙিন ফুল আর সুগন্ধীর বন্ধুত্ত্বের আশায়। দিনের আলো শেষে বিকেলের ছায়াতেই অন্ধকার নামে একটু একটু করে। নোনাধরা দুপুরের শেষে নিষ্প্রাণ যৌবনের মতো একা তেতে পুড়ে শেষ হয়ে যেতে পারে এমন একটা জীবন অবশিষ্ট থাকে শুধু! ঠিক সেই রকম একটা জীবনকে সাথে করে আজ নদীর ধারে এসেছে কমলা। সেই জীবনের যে রং চোখে দেখা যায়, সেই রং নয় বরং চোখের আড়ালে গাঢ় হয়ে ঝিম ধরে যে রং সেই রং নিয়ন্ত্রণ করে বেঁচে থাকার ছলাকলা! এতক্ষণ ঠিক সেই রঙের পৃথিবীটাকে একটা কাঁচের বোতলে বন্দী করে তাতে চোখ রেখেছিল কমলা। এদিক সেদিক থেকে কিচির মিচির পাখির ডাক ভেসে আসছে। ওরা গান গাইতে চাইছে বোধহয়! ভালোবাসার গান! ঠিক তখনি তাকে আবার দেখা গেল! পরনের সেমিজটা হাঁটুর উপর গুটিয়ে, একটা সুরতি মোষের পিছু পিছু গোড়ালি জল ডিঙিয়ে মূর্তি পারাপার করছে সে। মূর্তি নদীর জলে বোনা ঝাপসা আয়নায় তার কোন স্পষ্ট ছায়া পড়ে না! তার পায়ে পায়ে খেলা করে যায় বোরোলি মাছের ঝাঁক! দৃশ্যটার ভেতর অনেকখানি মায়া, অনেকখানি জাগতিক মাদকতা লুকিয়ে থাকে যেন! সেদিকে দেখতে দেখতে বুঝি কমলার মনের ভেতর শিরশিরে বাতাস বয়! বুকের মাঝে অজস্র খঞ্জনি বেজে ওঠে ঝনঝন! সব আনন্দ যেন ঠেসে জমা হয়েছে দৃশ্যটায়! এ দৃশ্য যেন তার বহুদিনের চেনা। যেন এর আগেও কয়েক হাজারবার দেখেছে সে। তবু আজ আবার তাকে দেখে ছন্নছাড়াভাবে স্বাধীন হবার বোধটা বুঝি আবার সজীব হয়ে উঠলো কমলার মনের ভেতর। সে যেন দেখতে ঠিক সেরকম, যেমনটা সংসারের শুরুর দিনগুলোতে কমলাকে দেখতে ছিল। ডাগর
চোখ, ঈষৎ ভারী বুক, বাঁকানো চিবুক, ডিঙি নৌকার মতন মুখ। বহু কাঙ্খিত ঘুমের ভাব থেকে সরে আসা একটা নিষ্পলক চাহনি নিয়ে সে যেন ওকে ওর গতজন্মের কথা বলে। জীবনের অলিগলি, ভুলভুলাইয়া পথে হারিয়ে যাওয়া অতীত খুঁড়ে, স্বযত্নে তুলে আনে একখানা আধপোঁড়া স্বপ্নের ফালি। ওকে দেখলেই খুব ভালোবাসতে ইচ্ছে করে কমলার! কিরকম একটা বৃষ্টি শুরু হয় ভেতর ভেতর! প্রথমে ঝিরঝিরে, তারপরে আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে বেগ। মনে মনে বেজে ওঠে রংপুরী ভাওইয়ার সুর।
“মইষাল রে, তোর মইষের গলার ঘন্টি
বাজে ঠুন ঠুনাইয়া রে…
সেই ঘন্টির শব্দে মোর পরান
কান্দে উঠে গুমরাইয়া রে।“
কিন্তু তারপর আর সুর মেলে না, তাল কেটে যায়! চৈত্র শেষের ঝোড়ো হাওয়ায় অবিন্যস্ত হয়ে পড়ে তার জট পাকিয়ে যাওয়া রুক্ষ্ম চুল। তার খোঁপা থেকে নদীতে পড়ে ভেসে যায় গোলাপী রঙের এক নাম না জানা ফুল। কমলাকে দেখে সে মাঝনদীতে দাঁড়িয়ে পড়েছে ততক্ষণে। ঈষৎ স্তনভারে সামনের দিকে ঝুঁকে গেছে তার শরীর। অর্ধ উন্মীলিত বক্ষদেশের নীচে তার নির্মেদ কটিদেশ বেরিয়ে রয়েছে, শাল জঙ্গলে পথ হারানো ভীরু হরিণীর মতো! না সেখানে মাতৃত্ত্বের কোন চিহ্ন নেই! হাত দুয়েক দূরত্ত্বে মন্ত্রমুগ্ধের মতো স্থির দুটো মানুষকে জড়িয়ে ধরে, ধোঁয়ার কুন্ডলী পাকানো এই হিম হিম কালবেলায় রচিত হয় এক অসীম, অপার মায়ার মাধুকরী। ও সুমিত্রা! নামটা অবশ্য কমলারই দেওয়া। খুব ছোটবেলায় যখন কমলার মা মারা গেল বসন্ত রোগে সেদিন প্রথম ওকে দেখেছিল কমলা। তারপর থেকে বেনের পুতুল নাচের আসরে, কাউনিয়ার বাড়ির আনাচে কানাচে, একা পুকুর ঘাটে, সন্ধ্যেবেলা তুলসীতলায়, ঋতু আসার আগে বা খুব নিকটজনকে দাহ করে ফিরে অশুচী হয়ে যাবার সময়ে আবার নিকট পরিবার পরিজনের হাতে ‘খারাপ’ হতে গিয়ে, ওর নিজের না বলা কথায়, বলে ফেলা সব কথায়, স্মৃতির পাতা হাতড়ে, সব খানে কমলা শুধু তাকেই দেখতে পায়। যৌবনের প্রথম মিলন কামনায় চঞ্চলা কিশোরীর মতন প্রবল কামজ্বরে পুড়েছে কমলা ওকে ঘিরে। ওদের দেহতাপে পুড়ে গেছে সেই গৃহস্থ দুপুরগুলো! আজও রাতের অন্ধকারে যখন ওর শোবার ঘরে বাঁধ ভাঙা রতির সন্ত্রাস চলে, ওর যোনিদেশে আঁকা হয় ভবিষ্যৎ নাগরিকত্ত্বের স্থায়ী বন্দোবস্ত, যখন ওর বুকে
হৃৎপিণ্ডের দৌড়োনো বেড়ে যায় প্রায় দুন্দুভি শব্দের বেগে, ওর নিম্নাঙ্গে ধেয়ে আসে রাতনিবিড়ের নিটোল চাকভাঙা মহুলের গন্ধতরল, ঠিক সেই সময় কাঁপা কাঁপা আলোয় তাকে প্রহেলিকার মতন ঘরের এককোণে বসে থাকতে দেখেছে কমলা! প্রেমিক চোখে ওর নাভির গভীরে আলতো জিভের ছোঁয়ায় দেশ-কাল-মানুষের মানচিত্র আঁকতে দেখেছে! সম্ভোগ শেষে হীরেন ওকে ছেড়ে দেবার পর ওর যন্ত্রণাক্লিষ্ট শরীরটার পাশে এসে বসেছে সুমিত্রা। ওর বিবশ শরীর জুড়ে বুলিয়ে দিয়েছে ময়ূর পালক। উন্মুক্ত জিহবা দিয়ে চেটে নিয়েছে ওর সব রক্ত-স্বেদ-বেদনা-ক্লান্তি! নরম হাতের পরশে ওর চোখ জুড়ে নেমে এসেছে বহু কাঙ্খিত হেমন্তের রাত! ঠিক যেন ওর মায়ের স্পর্শ! ওর কানে কানে এসে সে শুনিয়েছে, ছেলেবেলায় কমলার বাবার গলায় শোনা গাড়িয়ালের গান,
“ও মুই নাই ওর আর না জাইম গাড়িয়াল
তোমার গাড়িত চড়ি।
তোমার গাড়ির হাঙরাত বাজি
ছিরি গেইল মোর বিয়ার শাড়ি।”
সুর, গান এসব কমলার রক্তে! ওর বাবা নিজেই কত ভাওইয়া রচনা করেছেন! সুর দিয়েছেন! তা হয়তো কোথাও লেখা-জোকা নেই। মানুষের মুখে মুখে ঘুরে ঘুরে প্রচলিত তকমা পেয়ে গিয়েছে। কামতাপুরের আকাশ, বাতাস, ভাষা, লোকগানের সুর, পাখির শিস এই সব কিছুর ওপর ওদের আকণ্ঠ ঋণ! তাই তো মাতৃসম ভাষার বঞ্চনার বিরুদ্ধে গিয়ে নিজেদের দেশ গড়ার জন্য বাপ বেটায় মিলে সুর ছেড়ে বন্দুক নিয়েছিল হাতে। পুলিশের গুলি খেয়ে লাশ হয়ে ভেসে গেছিল বুড়িবাসরার জলে। দেশ বানায় মানুষ, মানুষই মানুষের স্বাধীনতার সীমানা বাঁধে! সেই মানুষ আবার সুরও তো বাঁধে! সুরের সাথে মিলেমিশে যেতে পারলে মানুষ নদী হয়ে যায়! স্রোতের মতন ঝর্ণা হয়ে গড়িয়ে পরে এক দেশ থেকে অন্য দেশে! খুব তীক্ষ্ণ একটা পাখির শিস ভেসে আসছে এখন। সুরটা বড় চেনা লাগে কমলার। ইষ্টিকুটুম! দূরের সজনে গাছে পাতায় মোড়া পিঁপড়ে বাসা, হাওয়ায় দোল খাচ্ছে ফুটবলের মতন। আগত বৈশাখের রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ এসব উপলব্ধি করে জঙ্গলের বুকে গাছেরা নতুন পাতা বোনার সুর তোলে। সময়ের বাঁকে গোত্তা খেয়ে সে সুর হয়তো জঙ্গলেই হারিয়ে যায়! সাধারণ মানুষের কান অবধি এসে পৌঁছয়
হৃৎপিণ্ডের দৌড়োনো বেড়ে যায় প্রায় দুন্দুভি শব্দের বেগে, ওর নিম্নাঙ্গে ধেয়ে আসে রাতনিবিড়ের নিটোল চাকভাঙা মহুলের গন্ধতরল, ঠিক সেই সময় কাঁপা কাঁপা আলোয় তাকে প্রহেলিকার মতন ঘরের এককোণে বসে থাকতে দেখেছে কমলা! প্রেমিক চোখে ওর নাভির গভীরে আলতো জিভের ছোঁয়ায় দেশ-কাল-মানুষের মানচিত্র আঁকতে দেখেছে! সম্ভোগ শেষে হীরেন ওকে ছেড়ে দেবার পর ওর যন্ত্রণাক্লিষ্ট শরীরটার পাশে এসে বসেছে সুমিত্রা। ওর বিবশ শরীর জুড়ে বুলিয়ে দিয়েছে ময়ূর পালক। উন্মুক্ত জিহবা দিয়ে চেটে নিয়েছে ওর সব রক্ত-স্বেদ-বেদনা-ক্লান্তি! নরম হাতের পরশে ওর চোখ জুড়ে নেমে এসেছে বহু কাঙ্খিত হেমন্তের রাত! ঠিক যেন ওর মায়ের স্পর্শ! ওর কানে কানে এসে সে শুনিয়েছে, ছেলেবেলায় কমলার বাবার গলায় শোনা গাড়িয়ালের গান,
“ও মুই নাই ওর আর না জাইম গাড়িয়াল
তোমার গাড়িত চড়ি।
তোমার গাড়ির হাঙরাত বাজি
ছিরি গেইল মোর বিয়ার শাড়ি।”
সুর, গান এসব কমলার রক্তে! ওর বাবা নিজেই কত ভাওইয়া রচনা করেছেন! সুর দিয়েছেন! তা হয়তো কোথাও লেখা-জোকা নেই। মানুষের মুখে মুখে ঘুরে ঘুরে প্রচলিত তকমা পেয়ে গিয়েছে। কামতাপুরের আকাশ, বাতাস, ভাষা, লোকগানের সুর, পাখির শিস এই সব কিছুর ওপর ওদের আকণ্ঠ ঋণ! তাই তো মাতৃসম ভাষার বঞ্চনার বিরুদ্ধে গিয়ে নিজেদের দেশ গড়ার জন্য বাপ বেটায় মিলে সুর ছেড়ে বন্দুক নিয়েছিল হাতে। পুলিশের গুলি খেয়ে লাশ হয়ে ভেসে গেছিল বুড়িবাসরার জলে। দেশ বানায় মানুষ, মানুষই মানুষের স্বাধীনতার সীমানা বাঁধে! সেই মানুষ আবার সুরও তো বাঁধে! সুরের সাথে মিলেমিশে যেতে পারলে মানুষ নদী হয়ে যায়! স্রোতের মতন ঝর্ণা হয়ে গড়িয়ে পরে এক দেশ থেকে অন্য দেশে! খুব তীক্ষ্ণ একটা পাখির শিস ভেসে আসছে এখন। সুরটা বড় চেনা লাগে কমলার। ইষ্টিকুটুম! দূরের সজনে গাছে পাতায় মোড়া পিঁপড়ে বাসা, হাওয়ায় দোল খাচ্ছে ফুটবলের মতন। আগত বৈশাখের রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ এসব উপলব্ধি করে জঙ্গলের বুকে গাছেরা নতুন পাতা বোনার সুর তোলে। সময়ের বাঁকে গোত্তা খেয়ে সে সুর হয়তো জঙ্গলেই হারিয়ে যায়! সাধারণ মানুষের কান অবধি এসে পৌঁছয় না।
তবু তো এ পৃথিবীতে সবই তৈরী হয়, দুঃখ-আনন্দ-হাসি-জন্ম-মৃত্যু-উৎসব! সব কিছু! নদীর বুকে কোন শ্রমজীবী জল ছেঁচে পাথর তুলছে এখন! এতে করে হয়তো মূর্তির বুক পরিষ্কার হবে! স্রোত আসবে! কমলা সুমিত্রা এখনও মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। মাঝে হয়তো সাদা দেওয়াল! বেপরোয়া প্রেমিকার মতন দুহাত দিয়ে সে আচ্ছাদন সরিয়ে নদী-মাঠ-পাহাড়ের আহবান নিয়ে সুমিত্রায় মিশে যেতে ইচ্ছে করে কমলার! যেন ওর আমি মিশে যাবে ওর নিজের আমিতেই! যেমন নদী গিয়ে শেষ হয় বড় নদীতে কিংবা শেষমেশ বাউল আঁকড়ে ধরে নিজের দোতারাকেই!
“কালা তোর দোতরার ডাং
কালা তোর ভাওইয়া গান
উরাং বাইরাং মোর মন থাকিবার না পারে
ও কালা রে..”
আজ এতক্ষণে নিশ্চয়ই ওদের ঝুপড়িটা ঘিরে আবার একটা জটলা জুটে গেছে। প্রতি দুপুরের মতো এই দুপুরেও ঝুপড়িতে ওদের ঘরে একাই ছিল কমলা। মাটিতে কোলেরটাকে শোয়ানো ছিল। আজ সকাল থেকে সেটা চিল চিৎকার করে কান্না জুড়েছে। বারবার চেষ্টা করেও তাকে থামাতে পারেনি কমলা। এখন ওর বুকে আর এক ফোঁটাও দুধ নেই! ভয়ংকর বেসুরো ওটা! ভয়ংকর বেতালা! লয়ের সাথে লয় মেলে না মোটে! সোম এ পড়ে যায় ফাঁকি! বড় ছেলেটা বাকিগুলোকে নিয়ে ইস্কুলে গেছে। ওদের মধ্যে তিনটে তিন ‘কেলাসে’ পড়ে আর বাকিগুলো ইস্কুলের বাইরে বসে থাকে, মিড ডে মিলের জন্য। হীরেন গেছে বিট অফিসে। এই সুডৌল বসন্তে নিজের কঙ্কালসার শরীরে নিদারুণ স্তন্যহীনতা আর অন্যদিকে খিদের জ্বালায় দুগ্ধপোষ্যের বিষম চিৎকার এই দুয়ের মাঝে পড়ে দিশেহারা হয়ে গেছিল কমলা। ওটাকে চুপ করাতে দুহাতে সজোরে ওর গলাটা চেপে ধরেছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই একেবারে চুপ! যেন রক্তচক্ষু দিয়ে শ্বাস রোধ করা হল ক্ষোভের! যে কোনো মৃত্যুই চাপাকান্নার শব্দ বয়ে নিয়ে আসে। কোথাও মৃত্যু হয় একটা গোটা জন্মেরই! কমলা এখন নির্বাক! ওর চোখে জল কিন্তু চেতনায় কোথাও শোক নেই হয়তো! ওর গলার কাছে দলা পাকিয়ে আছে মুক্তিহীন, অবসরহীন, অগোছালো দৃশ্যেরা। কাউনিয়ার সবুজ ধানক্ষেত, আলের উপর দিয়ে ছুটে চলে দুইটি মেয়ে, দেখতে হুবহু এক! ইন্ডিয়া
না। তবু তো এ পৃথিবীতে সবই তৈরী হয়, দুঃখ-আনন্দ-হাসি-জন্ম-মৃত্যু-উৎসব! সব কিছু! নদীর বুকে কোন শ্রমজীবী জল ছেঁচে পাথর তুলছে এখন! এতে করে হয়তো মূর্তির বুক পরিষ্কার হবে! স্রোত আসবে! কমলা সুমিত্রা এখনও মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। মাঝে হয়তো সাদা দেওয়াল! বেপরোয়া প্রেমিকার মতন দুহাত দিয়ে সে আচ্ছাদন সরিয়ে নদী-মাঠ-পাহাড়ের আহবান নিয়ে সুমিত্রায় মিশে যেতে ইচ্ছে করে কমলার! যেন ওর আমি মিশে যাবে ওর নিজের আমিতেই! যেমন নদী গিয়ে শেষ হয় বড় নদীতে কিংবা শেষমেশ বাউল আঁকড়ে ধরে নিজের দোতারাকেই!
“কালা তোর দোতরার ডাং
কালা তোর ভাওইয়া গান
উরাং বাইরাং মোর মন থাকিবার না পারে
ও কালা রে..”
আজ এতক্ষণে নিশ্চয়ই ওদের ঝুপড়িটা ঘিরে আবার একটা জটলা জুটে গেছে। প্রতি দুপুরের মতো এই দুপুরেও ঝুপড়িতে ওদের ঘরে একাই ছিল কমলা। মাটিতে কোলেরটাকে শোয়ানো ছিল। আজ সকাল থেকে সেটা চিল চিৎকার করে কান্না জুড়েছে। বারবার চেষ্টা করেও তাকে থামাতে পারেনি কমলা। এখন ওর বুকে আর এক ফোঁটাও দুধ নেই! ভয়ংকর বেসুরো ওটা! ভয়ংকর বেতালা! লয়ের সাথে লয় মেলে না মোটে! সোম এ পড়ে যায় ফাঁকি! বড় ছেলেটা বাকিগুলোকে নিয়ে ইস্কুলে গেছে। ওদের মধ্যে তিনটে তিন ‘কেলাসে’ পড়ে আর বাকিগুলো ইস্কুলের বাইরে বসে থাকে, মিড ডে মিলের জন্য। হীরেন গেছে বিট অফিসে। এই সুডৌল বসন্তে নিজের কঙ্কালসার শরীরে নিদারুণ স্তন্যহীনতা আর অন্যদিকে খিদের জ্বালায় দুগ্ধপোষ্যের বিষম চিৎকার এই দুয়ের মাঝে পড়ে দিশেহারা হয়ে গেছিল কমলা। ওটাকে চুপ করাতে দুহাতে সজোরে ওর গলাটা চেপে ধরেছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই একেবারে চুপ! যেন রক্তচক্ষু দিয়ে শ্বাস রোধ করা হল ক্ষোভের! যে কোনো মৃত্যুই চাপাকান্নার শব্দ বয়ে নিয়ে আসে। কোথাও মৃত্যু হয় একটা গোটা জন্মেরই! কমলা এখন নির্বাক! ওর চোখে জল কিন্তু চেতনায় কোথাও শোক নেই হয়তো! ওর গলার কাছে দলা পাকিয়ে আছে মুক্তিহীন, অবসরহীন, অগোছালো দৃশ্যেরা। কাউনিয়ার সবুজ ধানক্ষেত, আলের উপর দিয়ে ছুটে চলে দুইটি মেয়ে, দেখতে হুবহু এক! ইন্ডিয়া
থেকে বয়ে আসা সরু নদীগুলোয় ঝাঁপায় তারা অহরহ! সাঁতরে চলে যায় ওপারে। সর্ষে ক্ষেতের ভেতর দুজনে জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকে সারা বেলা। দূরে মুখ তুলে দেখে ইন্ডিয়ার বর্ডার, বিএসএফ এর চেকপোস্ট। সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরে আসে তারা ছায়াঘেরা সবুজ বাঁশবনের ভেতর দিয়ে। তুচ্ছ বেঁচে থাকা ও মরে যাওয়ার মাঝে, গৃহহীন, রাষ্ট্রহীন ওই দুইজন কান পেতে থাকে রাতের তারার দিকে। সুরেলা মিঠে বাতাসে কোমল নিষাদের মতন তখন ভেসে আসে অনাম্নী কোন সাধকের গাঁথা বিনিসুতোর ভাওয়াইয়া,
“উড়িয়া যায় চখুয়ার পঙ্খী বগীক বলে ঠারে
ওরে তোমার বগা বন্দী হইছে ধল্লা নদীর পারে রে।
ফান্দে পরিয়ে বগা কান্দে রে..”
জঙ্গলে এখন বৃষ্টি নেমেছে হঠাৎ করেই। অবিরাম বৃষ্টি! মূর্তির শীর্ণ শরীরে যেন হঠাৎ করে বান ডেকেছে! অনুভূতির দুর্বলতম জায়গায় গভীর আঘাত পেয়ে এক মাঝি নদী পাড়ে হাপুস নয়নে কাঁদতে বসেছে! বৃষ্টির তোরে তার নৌকাখানা ভেসে গেছে। জঙ্গলের পাখিদের ডানার পালক ভিজে ভারী হচ্ছে ক্রমশঃ। অসুখের দুঃখ, অন্যায়ের দুঃখ, বঞ্চনার দুঃখকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে রেখে একটা নতুন জন্মকে আর নিজের পরিচয়ের দলিল বানাতে এখন নারাজ কমলা। সে চাইছে পাখি হয়ে বাঁচতে শুধু বাঁচার আনন্দে।






Leave a Reply